আপনাকে আমাদের ব্লগে স্বাগত জানাই



অ্যানাউন্স হয়ে গেছে


                                   
   
                                                               

বৃষ্টি পড়ছিল। এরকম বৃষ্টির সময় প্ল্যাটফর্মে বসে থাকতে আমার খুব ভালো লাগে। প্ল্যাটফর্মের বসবার জায়গায় বসে বৃষ্টি দেখছি। লোকজন আছে , তবে সেরকম ভীড় নেই। অ্যানাউন্সমেন্ট হয়ে গেছে। এক্ষুণি একটা ডাউন ট্রেন ঢুকে পড়বে শিলিগুড়ি গামী। তখন প্ল্যাটফর্মের আলাদা দৃশ্য। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে কাক গুলোকে এখন আর দেখা যাচ্ছে না। বিকেল ৫টার পর তাদেরও ঘরে ফেরার তাগিদ থাকে। তার মধ্যে বৃষ্টি। সিগারেট খাওয়ার জন্য গলা জিভ উসখুস করছে। কিন্তু এখানে সিগারেট খাওয়ার নিয়ম নেই। একটা সুরেলা মিউজিকের সাথে একটানা কোন নারী কন্ঠ বলেই চলেছে ,' স্টেশন চত্বরে ধূমপান করবেন না। কেউ কিছু দিলে খাবেন না , সে আপনাকে বেহুঁশ করে আপনার সব কিছু লুট করতে পারে।'
  আমার অবশ্য লুট হওয়ার মত কিছু নেই। কাঁধ ব্যাগটায় একটা বই , মায়ের দেওয়া বাজারের স্লিপ ও একটা বাঁধানো খাতা। আমি তো যাত্রী নই। যাচ্ছিলাম তিস্তার স্পারে। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো , গন্তব্য বদলে রেলস্টেশন। অবিশ্যি প্ল্যাটফর্ম টিকিট কিনেছি। বেকার ছেলে হলেও বিনা টিকিটে ঢুকে পড়িনা যেখানে সেখানে।
     টিন শেড থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়া দেখছি। টপ টপ করে লাইনের উপর পড়ছে আর ছিটকাচ্ছে। ঘড়িতে ১৭ :১০ মানে ৫টা দশ। এমন সময় হুইসেল শোনা গেল। ট্রেন আসছে। সারা প্ল্যাটফর্মে হঠাৎই ভীষণ ভাবে ব্যাস্ততা শুরু হয়ে গেল। যাত্রীরা উঠে দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউ অতি উৎসুক যাত্রী প্ল্যাটফর্মের অনেকটা ধারে চলে গিয়ে ঝুঁকে পড়ে দেখছে ট্রেন আসা। এটা যে এরা কেন করে কে জানে! ট্রেন তো দেখাই যাচ্ছে। ঝুঁকে দেখলেই কি ট্রেন তাড়াতাড়ি চলে আসবে?
    অবশেষে প্ল্যাটফর্ম চিরে ঢুকে পড়লো ট্রেন। আমি নির্বিকার ভাবে বসে রইলাম। মাঝেমধ্যে এমন বসে বসে লোকজন দেখা ভাল। আর বিচিত্র মানুষ জন দেখতে হলে রেল স্টেশন হচ্ছে আদর্শ।
মেয়েটা নেমে এল। 'রেল গাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা , আগে ওকে বারবার দেখেছি ' না , হলুদ শাড়িতে নয় , ফেসবুকে। প্রোফাইল পিকচার খুব ঘনঘন বদলায় এই মেয়েটি। আজ প্রথম বার জলজ্যান্ত দেখছি। সবুজ টিয়াপাখি রঙের চুড়িদার - ফর্সা গায়ের রঙ … নাহ্ এ অনেকটা সাদামাটা বর্ননার মত হয়ে যাচ্ছে। আমি অবিশ্যি বর্ননায় তত পটু নই। পাঠক চট করে একটা রূপসী নারীকে অনুমান করে নিন। ধরুন চুলগুলো কাঁধের উপর লুটোপুটি খাচ্ছে। সিল্কি চুল। মোলায়েম পেলব ত্বক।উন্নত বুক। স্লিম ফিগার্। ৫'৭" আন্দাজ উচ্চতা। ও হ্যাঁ , চোখে একটা পাতলা ফ্রেমের চশমা রয়েছে , যাতে করে সৌন্দর্যের মাঝে একটু স্নিগ্ধতাও প্রকাশ পাচ্ছে। আমি মাথা চুলকোচ্ছিলাম। হাতটা চুলেই রয়ে গেল। স্বভাবতই এমন সুন্দরী মেয়ে দেখলে নোলা তো হয়ই। আর আমি একটু এমন ধরনেরই। অবশ্য আমিই কেন , যেকোনো পুরুষ মানুষের যদি এমন না হয় তবে তাকে … থাক আর বললাম না। এত লোকজনের ভীড়েও হয়না যে বিশেষ একজনের দিকে নজর পড়ে যায়!  এটাও তাই। আমি চোখ ফেরাতেই পারছিনা। মেয়েটি ট্রেন থেকে নেমে প্ল্যাটফর্মের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত একবার তাকালো। আমি যে জায়গায় বসে ছিলাম সেখানে এসেই ওর কামরাটা থেমেছিল। ভাবলাম ওর বাবা মা বেরিয়ে আসবেন কামরা থেকে বা কেউ একজন। কিন্তু ও নেমে এসে আমার পাশের বসার জায়গাতেই ফাঁকা পেয়ে এসে বসলো। ওর সাথে কেউ নেমে এলোনা। কাঁধে ভ্যানিটিব্যাগ আর হাতে একটা ট্রলি ব্যাগ। ব্যাস আর লাগেজ নেই লোকজনও নেই। অবাক লাগলো! একজন এত সুন্দরী মেয়েকে কেউ বাড়ি থেকে একা একা ছাড়ে! বিশেষত সামনে ইলেকশন।
    আমি মেয়েটির শরীর মুখ কোথা থেকেও একবারের জন্যও দৃষ্টি সরাইনি। এবার সরাতে হল। কেননা ও আমার পাশেই এসে বসেছে , আর এখন ওর দিকে হা করে তাকিয়ে থাকা অভদ্রতা। বেশ মিষ্টি একটা পারফিউমের গন্ধে এখানকার বাতাসটা সুবাসিত হয়ে উঠেছে। ওর নামটা জানিনা , কেননা ফেসবুকে ওর নাম লেখা নেই। লেখা আছে " ড্যাজলিং সেন।" এটা আমি খুবই অপছন্দ করি ঠিকই কিন্তু তাতে কার কি যায় আসে! ওর সাথে কথা বলার লোভটা সামলাতে পারছিনা। আমার চোখের সামনে এখন এই মেয়েটি ছাড়া সমস্ত প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা হয়ে গেছে। মানে আমার আর অন্য কিছু নজরের মধ্যেই আসছেনা। হঠাৎ মেয়েটি আমাকে বলে বসলো , " আপনি এখানে কিছুক্ষণ আছেন তো?"
মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললাম।
- " আমার ব্যাগটা তবে একটু দেখবেন? আমি এনকোয়ারি থেকে একটু খোঁজ করেই আসছি।
- " যান , আমি আছি।" হেসে জানালাম। এত তাড়াতাড়ি কাউকে কেউ আজকাল বিশ্বাস করেনা। কিন্তু মেয়েটা আমাকে কিভাবে বিশ্বাস করলো কে জানে। ভালোও লাগলো। মেয়েটা নিজে থেকেই আমার সাথে কথা বলেছে। তক্কে তক্কে থেকে ভালো নামটা জেনে নিতে হবে। আর এটাও জানিয়ে দিতে হবে যে আমরা ফেসবুকে মিউচুয়াল। হে হে। তবে ঘনিষ্ঠতাটা আরও তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে।

  বেশ কিছুক্ষণ হল বসে আছি। মেয়েটা সেই যে গেল আর আসেনি। আশ্চর্য!  ওর ব্যাগটা ফেলে উঠে যেতেও পারছিনা। শত হলেও একটা দায়িত্ব তো থেকেই যায়। সাড়ে ছটার সময় একবার নীলাদ্রিদার বাড়ি যেতে হবে। এখন ছটা বেজে গেছে। উসখুস করতে লাগলো মনটা। ও এতক্ষণ কি করছে? হঠাৎ ধাঁ করে মাথার মধ্যে বিদ্যুৎ চমকের মত একটা চিন্তা ঝিলিক দিয়ে গেল। এই ট্রলিব্যাগে কোন অবৈধ বস্তু অর্থাৎ বিস্ফোরক বা ওই জাতীয় কিছু নেইতো? মেয়েটা আমাকে বোকাসোকা ছেলে ভেবে গছিয়ে দিয়ে কেটে পড়েনি তো? তাহলে তো --- আমার সমস্ত শরীর এই বৃষ্টির পর ঠান্ডা ওয়েদারেও ঘেমে উঠলো ভীষণ। রক্ত চলাচল দ্রুত হয়ে গেছে। আমি দ্বিধার মধ্যেও বেশ বুঝতে পারছি আমার হার্টবিট আগের তুলনায় অনেকটা বেড়ে গেছে। একবার ভাবলাম এটা বোধহয় টাইম বোমের ধকধকানি , কিন্তু ভ্রম নিজেই কেটে গেল।আমি এই ব্যাগ নিয়ে এখন নিজেই জলজ্যান্ত মানব বোমা।
   এনকোয়ারির দিকটায় চোখ তুলে তাকালাম। ভীড়ের মধ্যে মেয়েটাকে কিছুতেই আর নজরে পড়ছেনা। আগের বার কেমন চট করে ওর দিকেই চোখ গিয়েছিল কিন্তু এখন ... আমি কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছিনা। একবার মাথার মধ্যে যদি 'কু' জিনিস ঢুকে পড়ে তবে চট করে তা বের হতে চায়না। আমি কিছুতেই ভাবতে পারছিনা যে ওর মধ্যে বোম নেই। জামাকাপড় ও অন্যান্য সাধারণ সামগ্রীই রয়েছে।
 হঠাৎ এবার নজরে এলো আর.পি.এফ এর কয়েকজন , ওরা বেশ দ্রুত পদক্ষেপে  এদিকেই যেন আসছে। সর্বনাশ!  ওরা কি এর মধ্যেই খবর পেয়ে গেছে যে আমি একটা বোম ভর্তি ব্যাগ নিয়ে ...
  "কেউ কিছু দিলে খাবেননা , সে আপনাকে বেহুঁশ করে আপনার সব কিছু লুট করতে পারে।"  আমার কাছে লুট হওয়ার মত কিছু নেই। শুধু কাঁধ ব্যাগে একটা বই , মায়ের দেওয়া বাজারের স্লিপ ও একটা বাঁধানো খাতা। কিন্তু এখন বেশ বুঝতে পারছি সেই যান্ত্রিক নারীকন্ঠ যেন আমাকেই বিদ্রুপ করে চলেছে অ্যানাউন্সের ভাষায়। এই অস্বস্তিকর ব্যাগটা গছিয়ে দিয়ে যে সুন্দরী মেয়েটি এনকোয়ারিতে চলে গেছে , সে আমার সমস্ত সাহস লুট করে নিয়ে গেছে যাওয়ার সময়। একবার ব্যাগটার দিকে তাকালাম , একবার আরপিএফ , একবার নিজের দিকে - সামনে ইলেকশন , একটা সুন্দরী মেয়ে - মাথাটা ভয়ানক ভাবে টাল খাচ্ছে , যেন গোত্তা খেয়ে এক্ষুনি মাথার ওপর ধ্বসে পড়বে প্ল্যাটফর্মের চালটা ...
 আবার শোনা যাচ্ছে সুরেলা মিউজিকের সাথে সেই সুরেলা কন্ঠের অ্যানাউন্সমেন্ট ...



                                      ( চিত্রঋনঃইন্টারনেট)

5 comments:

  1. দারুন টেনশন তৈরী করেছতো ! নিখুঁত গল্প ।

    ReplyDelete
  2. amar ei prosonge akta choto purono ghotona mone porlo bole toke boli akbar,tokhono chakri paini, train e chepe kolkata theke bari firchi aka ami....kamra te aro dujon ache bote tobe amar nijer porichito keo noy...train ta ese kono akta okhyato statione darieche hoyto signal paini bole ,ami janla diye bairer drisyo dekhchi amon somy amader samne dujon hijre ese tali bajie daralo , ami bollam "bekar hu mai. kya lega tu mujhse...." to hijra ta amake pase ese jore dhakka mere bollo "abe chikne khudko kavi bekar mat bolna...."----tor lekha pore amaro ektu lekhar ichcha holo..........khub valo likhechis .

    ReplyDelete
  3. Thank you mejda , lekhata ekhanei swarthakata pelo , ei je tumi likhle!

    ReplyDelete
  4. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete